২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাজেটের আকার হবে ৮ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, যা চলমান ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা বাজেটের চেয়ে প্রায় ৬ শতাংশ বেশি।
দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে চলতি অর্থবছরের বাজেটীয় লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে বাস্তবভিত্তিক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শের সঙ্গে মিল রেখে ও চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটের আকার কমানো এবং আগামী অর্থবছরে আরও কম রাখার পরিকল্পনা করেছে।
অর্থনৈতিক সংকট ও কৃচ্ছ সাধন কর্মসূচির মধ্যে আগামী অর্থবছরের (২০২৪-২৫) জন্য সম্প্রসারণমূলক বাজেট দেওয়ার পথ থেকে সরে আসছে অর্থ বিভাগ। নতুন বাজেটটি হবে অনেকটা সংকোচনমূলক। মূলত রাজস্ব আহরণ কম, আমদানি ও রপ্তানি পরিস্থিতি ভালো নয়। আগামী বছরও এ অবস্থা অব্যাহত থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নির্বাচনের বছরেও দেশে মূল্যস্ফীতি কমছেই না। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার ধারেকাছেও নেই মূল্যস্ফীতি। অর্থবছর শুরুর মাস জুলাইয়ের পর থেকেই মূল্যস্ফীতি রয়েছে ৯ শতাংশের ঘরে।
অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হারও অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। আবার রাজস্ব আদায়ের চিত্রও নিম্নমুখী, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রকৃত আদায়ে অনেক ঘাটতি। ভালো আসছে না প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) ও রপ্তানি আয়। ডলার–সংকট তো আছেই।
আগামী বাজেটের সম্ভাব্য আকার : মোট ব্যয় ৮ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, আয় ৫ লাখ ৫৫ হাজার কোটি টাকা এবং ঘাটতি ২ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা। এক্ষেত্রে চলতি বাজেটের চেয়ে আকার বাড়ছে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়বে ৫১ হাজার ১০০ কোটি টাকা।
অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের সভাপতিত্বে ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত আর্থিক, মুদ্রা ও বিনিময় হার-সংক্রান্ত কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, অর্থসচিব খায়েরুজ্জামান মজুমদার, বাণিজ্যসচিব তপন কান্তি ঘোষ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকী, পরিকল্পনাসচিব সত্যজিৎ কর্মকার প্রমুখ অংশ নেন।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধির হার ৭ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ করা হচ্ছে। আর মূল্যস্ফীতির বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা ৬ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে করা হচ্ছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। নভেম্বর পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা অক্টোবরে ছিল ৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ গড় মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের ওপরেই থাকছে।
দুপুর আড়াইটায় জুমে বৈঠক শুরু হয়ে চলে বিকাল ৪টা পর্যন্ত। অর্থনীতি খাতের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের বৈঠকে আমদানি, রপ্তানি পরিস্থিতি, এডিপিসহ চলতি বাজেট বাস্তবায়ন হার নিয়ে আলোচনা হয়। এছাড়া ভর্তুকি পরিস্থিতি, সুদহার, ব্যাংক ঋণ পরিস্থিতি, পুঁজিবাজার, রাজস্ব খাত, সঞ্চয়পত্র, মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধির বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে।
চলতি বছরের সংশোধিত বাজেট : মোট ব্যয় ৭ লাখ ৬১ হাজার ৭৮৫ কোটি থেকে কমিয়ে ৭ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। মোট রাজস্ব আয় ৫ লাখ ৩ হাজার কোটি থেকে কমিয়ে ৪ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। রাজস্ব আয় কমানো হয়েছে ৩৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। এক্ষেত্রে বাজেটে নতুন ঘাটতি দাঁড়াবে ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা। এডিপির আকার ২ লাখ ৬৩ হাজার কোটি থেকে কমে ২ লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এডিপি কাটছাঁট করা হয়েছে ১৮ হাজার কোটি টাকা।
সূত্র জানায়, এছাড়া গাড়ি কেনা, ভূমি অধিগ্রহণ, ভবন নির্মাণসহ অন্যান্য কার্যক্রম বন্ধ রাখা হচ্ছে। এটি অব্যাহত থাকবে। চাহিদার দিক থেকে অনেক কিছু হ্রাস করা হচ্ছে। অপরদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরবরাহ ঠিক রাখতে গিয়ে টিসিবি ও ওএমএস কর্মসূচির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ বৃদ্ধি, বাজার মনিটরিং জোরদার করার সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া বিলাসী পণ্য আমদানি কমানো হয়েছে।
সূত্র আরও জানায় ,চলতি অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির দিকে নজর কম থাকবে। চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। নানা প্রেক্ষাপটে এটি অর্জন সম্ভব হয়। ফলে প্রবৃদ্ধি কমিয়ে ৬ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে সমন্বয় রেখেই প্রবৃদ্ধি কমিয়ে আনা হচ্ছে। বৈঠকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়াকে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব হিসাবে দেখা হয়েছে। এছাড়া সরকারের ঋণের সুদহার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কারণ, সুদ পরিশোধে সরকারের অনেক ব্যয় হচ্ছে।