দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডার যেন চোরাই পণ্য হয়ে গেছে। সংকটের দোহাই দিয়ে সিলিন্ডার ব্যবসায়ীদের চলছে ইঁদুর-বিড়াল খেলা। প্রকাশ্যে দোকানে দেখা মিলছে না, তবে মুঠোফোনে দাম ঠিক করে অজানা স্থান থেকে ঠিকই সিলিন্ডার হাজির করছেন ব্যবসায়ীরা।
সরেজমিনে বাজারের খুচরা দোকানগুলোতে দেখা যায়, শুধু খালি সিলিন্ডার রয়েছে; বলা হচ্ছে গ্যাস নেই। খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, গ্রাহকরা বারবার এসে বিরক্ত করছেন। তাই দোকান বন্ধ রাখা হচ্ছে।
তবে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে একই সিলিন্ডার দ্বিগুণ দামে মিলছে। মুঠোফোনে একজন ব্যবসায়ী বলেন, আমার কাছে গ্যাস নেই, তবে দেখতে পারি। বেশি দরকার হলে দেয়া যাবে। দাম বেশি পড়বে। সকালে একটি সিলিন্ডার ২৫০০ টাকায় বিক্রি করেছি।
এদিকে বাজারে এক বা দুটি নয়, ভ্যান ভর্তি গ্যাস আসছে। ক্যামেরা দেখেই দৌড়াতে থাকেন ব্যবসায়ীরা। এমন ইঁদুর-বিড়াল খেলা চলে সরবরাহকারীর গোডাউনেও। টঙ্গির নতুন বাজারের একটি গোডাউনে দেখা গেছে ভর্তি সিলিন্ডার, বেচা-বিক্রি চলছে। ক্যামেরা নিয়ে ঢুকতেই কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই লাপাত্তা হয়ে যায়, দরজায় তালা ঝোলানো হয়।
কৌশলে ভেতরে ঢুকলে দেখা মেলে গ্যাস ভর্তি সিলিন্ডারের। এবার সংকট নয় ডেমারেজের দোহাই দিয়ে দাম বাড়ানোর দাবি সরবরাহকারীর। তিনি জানান, একটা গাড়ি গেলে ১০-১২ দিন বসে থাকতে হয়। সম্প্রতি একটি গাড়ির জন্য প্রায় ৬০ হাজার টাকা ডেমারেজ দিতে হয়েছে।
এভাবেই নিত্যপ্রয়োজনীয় সিলিন্ডার গ্যাস দেশে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বিক্রি করা হচ্ছে। গ্রাহকরা বলছেন, দোকানে গ্যাস নেই বললেও ফোন করলে ২০০০, ২২৫০ বা ২৫০০ টাকায় গ্যাস পাওয়া যায়। মূলত দোকান ভর্তি খালি সিলিন্ডার, কিন্তু বেশি টাকা দিলে ঠিক দোকানের সামনে থেকেই গ্যাস মেলে।
কৃত্রিম এই সংকটের কারণ আসলে কী? বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার গ্যাস নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করলে খুচরা ব্যবসায়ীর লাভ হয় মাত্র ৫০ টাকা। প্রতিদিন ২০০ সিলিন্ডার বিক্রি করলে লাভ হয় ১০ হাজার টাকা। কিন্তু সংকট ধরে বিক্রি করলে প্রতিটি সিলিন্ডারে ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত লাভ হয়। এতে লাভ দাঁড়ায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা। সারাদেশের ৪ কোটি গ্রাহকের ওপর হিসাব করলে সিন্ডিকেটের লাভ প্রায় ৩২ হাজার কোটি টাকা।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর বলছে, এটি একটি বড় সিন্ডিকেটের কাজ। ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস জানান, কিছু অসৎ ব্যবসায়ী মজুত গড়ে তুলেছে। যারা বেশি টাকা দিচ্ছে, তারাই গ্যাস পাচ্ছে।
এলপিজি আমদানি নিয়ে পিআইডির তথ্য অনুযায়ী, গত নভেম্বর মাসে ১ লাখ ৫ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি গ্যাস আমদানি করা হয়েছিল। তখন কোনো সংকট দেখা যায়নি। কিন্তু পরের মাসে আরও ২২ হাজার মেট্রিক টন বেশি আমদানি হলেও কৃত্রিম সংকট শুরু হয়।