কখনো লিফট কিনতে, কখনো বিছানার চাদর কিনতে কিংবা মাছ চাষ, কিংবা খিচুরি রান্না শিখতে বিদেশ যাওয়ার আবদার করেন সরকারি কর্মকর্তা। এবার ঘাস (নেপিয়ার) চাষ শিখতে বিদেশ যেতে চান প্রাণিসম্পদ অধিদফতরের ৩২ কর্মকর্তা। বিদেশের এ তালিকায় রয়েছে অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। এই ঘাস চাষ শিখতে বিদেশে যেতে খরচ ধরা হয়েছে ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। প্রত্যেক কর্মকর্তা খরচ বাবদ পাবেন ১০ লাখ টাকা।
দেশে গবাদিপশুর জন্য পুষ্টিকর ঘাস উৎপাদনের লক্ষ্যে ‘প্রাণী পুষ্টির উন্নয়নে উন্নত জাতের ঘাসের চাষ সম্প্রসারণ ও লাগসই প্রযুক্তি হস্তান্তর’ নামে একটি প্রকল্প নেয় সদ্য সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ১১৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। ২০২১-২৪ সালের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটির মেয়াদ বেড়েছে এক বছর। বিগত সময়ে প্রকল্পের টাকায় ঘাস চাষ প্রশিক্ষণে বিদেশ ভ্রমণে যেতে না পারায় এখন বিদেশ যেতে চান ৩২ কর্মকর্তা।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, বিগত সরকার সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় কোনো ধরনের যাচাইবাছাই ছাড়াই ১১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি নেয়। প্রকল্পটিতে কর্মকর্তাদের বিদেশে গিয়ে এই প্রশিক্ষণ গ্রহণে তেমন কোনো সুফল মিলবে না।
জানা গেছে, তিনবছর আগে দুর্যোগকালীন গো-খাদ্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে নেয়া এই প্রকল্প শুরু হয়, শেষ হওয়ার কথা আগামী ডিসেম্বরে। এই সময়ের মধ্যেই সারাদেশে স্থাপন করা হবে প্রায় ৮ হাজার ৯৭০টি প্রদর্শনী প্লট। অথচ এখন পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে মাত্র ২৭ শতাংশ অর্থ বা ৩১ কোটি ৫২ লাখ ১৭ হাজার টাকা। তাই নির্ধারিত সময়ে শেষ না হওয়ায় বাড়তি আরো একবছর চাওয়া হয়েছে।
প্রকল্প পরিচালক আমজাদ হোসেন ভুইয়া গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তিন বছরে প্রকল্পটি শেষ করা যায়নি। তাই আরো একবছর সময় চাওয়া হয়েছে। তবে এসব ছাপিয়ে আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে যাওয়ার খায়েশ।
তথ্য অনুযায়ী, এই ঘাস চাষে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিতে অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে যেতে চান ৩২ কর্মকর্তা। যাতে গচ্চা যাবে সোয়া তিন কোটি টাকা (৩ কোটি ২০ লাখ টাকা)। অথচ এই ঘাস বাংলাদেশে চাষ হয়ে আসছে বহু বছর ধরেই। তাই পুরো ব্যয়কে অযৌক্তিক বলছেন বিশ্লেষকরা।
রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের চেয়ারম্যান আবদুর রাজ্জাক এ বিষয়ে বলেন, এর আগেও আমরা দেখেছি প্রজেক্টের কারণে বিদেশে গিয়েছেন সরকারি কর্মকর্তারা। তবে আসার পরেই পোস্টিং হয়ে যায় অন্যত্র বা অবসরে চলে গেছেন। ফলে আসলে আমরা সেখান থেকে খুব একটা সুবিধা অর্জন করতে পারিনি। এ জন্যে মনে করি- সরকারি কর্মকর্তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণ বা ভ্রমণের জন্যে আরেকটু সতর্কতা অবলম্বন করা উচিৎ।
টিআইবি নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলছেন, আমলাতন্ত্রের মধ্যে এক ধরনের মানসিকতা তৈরি হয়েছে যে, কোনো না কোনো সুযোগে বিদেশ যেতে হবে। এই বিদেশ যাওয়ার উদ্দেশ্য প্রশিক্ষণ একদমই না। ঘাস উৎপাদন, মশা মারার প্রশিক্ষণ এগুলোর জন্যে বিদেশ যাওয়াটা শুধু নামে। মূল বিষয়টা হচ্ছে বিদেশ গেলে সে রাষ্ট্রীয় টাকায় প্রমোদ ভ্রমণের সুবিধা পাচ্ছে।
অপ্রয়োজনীয় প্রকল্প বন্ধ ও বিলাসী খাতে অর্থ ছাড়ে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। সেই পরিস্থিতিতে এমন খায়েশে হতবাক পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ও।