দীর্ঘ দুই দশকের পথচলা, অসংখ্য ভাঙা-গড়ার গল্প, কান্নার জল আর হাসির জোয়ারের পর আর্জেন্টিনার জাতীয় দলে লিওনেল মেসির অধ্যায়টি যেন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে শেষ হতে চলেছে। ভক্তরা জানতেন এই দিনটি একদিন আসবে, কিন্তু যখন সেই দিনটি চোখের সামনে উপস্থিত হয়, তখন ফুটবল বিশ্বের প্রতিটি কোণে নেমে আসে এক নিঃশব্দ হাহাকার।
মেসির ফুটবল জীবনের পথচলা শুধু গোল করা বা ট্রফি জেতার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। এটি ছিল একজন মানুষের অধ্যবসায়, ব্যর্থতা থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে ওঠা এবং একটি দেশের ফুটবলপ্রেমীদের দীর্ঘ তিন দশকের খরা কাটানোর এক অবিশ্বাস্য গল্প।
১৯৮৭ সালে আর্জেন্টিনার রোসারিও শহরে জন্ম নেওয়া এক লাজুক শিশু লিওনেল মেসি, যার গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি বা বৃদ্ধিজনিত সমস্যা ছিল। সেখান থেকে বার্সেলোনা ক্লাবের সহায়তায় স্পেনে পাড়ি জমানো এবং পরবর্তীতে ফুটবলের সিংহাসনে আরোহণ করা—এ গল্প অনেকেরই জানা। কিন্তু স্পেনের লোভনীয় অফার ফিরিয়ে দিয়ে নিজ মাতৃভূমি আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিকেই বেছে নিয়েছিলেন মেসি।
তবে এই নীল-সাদা জার্সিতে তার শুরুটা কিন্তু মোটেই রূপকথার মতো ছিল না। ২০০৫ সালে হাঙ্গেরির বিপক্ষে জাতীয় দলে অভিষেক ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয়েছিল এই জাদুকরকে। এরপর ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের বিশ্বকাপ—প্রতিটি পদক্ষেপে জুটেছে শুধুই হতাশা। বিশেষ করে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে ফাইনালে জার্মানির কাছে হেরে ট্রফির এতো কাছাকাছি এসেও খালি হাতে ফেরা, কিংবা ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে টানা পরাজয়—সব মিলিয়ে একসময় অভিমানে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরই নিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
কিন্তু যার কপালে বিশ্বজয়ের মুকুট লেখা, তিনি কি এভাবে হেরে যেতে পারেন? ভক্তদের আকুল আবেদন এবং দেশের টানে মেসি আবার ফিরে এসেছিলেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে। ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় দিয়ে শুরু হয় আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক পুনর্জাগরণ। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলকে হারিয়ে দীর্ঘ ২৮ বছর পর আর্জেন্টিনাকে প্রথম বড় কোনো ট্রফি এনে দেন মেসি।
এরপর ২০২২ সালের ফিনালিসিমা জয় এবং একই বছর কাতারের মাটিতে সেই বহুল প্রতিক্ষিত বিশ্বকাপ ট্রফি উঁচিয়ে ধরা—লিওনেল মেসি ফুটবলকে যা দেওয়ার তা যেন পূর্ণাঙ্গ রূপ পেয়েছিল সেই এক ট্রফিতেই। ফ্রান্সের বিপক্ষে সেই রোমাঞ্চকর ফাইনাল ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ফাইনাল হিসেবে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপ জয়ের পর এবং পরবর্তী কোপা আমেরিকা জয়ের পর মেসির বয়স ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বর্তমানে বয়সের কোঠা ৩৭ পার করে ৩৮-এর দিকে ধাবমান। আন্তর্জাতিক ফুটবলের তীব্র গতি ও শারীরিক চাপের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া বয়স বাড়ার সাথে সাথে কঠিন হয়ে পড়ে। মেসি নিজেও বহু সাক্ষাৎকারে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপে খেলা তার জন্য বাস্তবসম্মত নয় এবং শরীর যেভাবে সায় দেবে, ঠিক সেভাবেই তিনি তার সিদ্ধান্ত নেবেন।
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে তার উপস্থিতি, মাঠ থেকে বিদায় নেওয়ার দৃশ্য এবং সহ খেলোয়াড়দের মন্তব্য—সবকিছুতেই যেন এক আবেগঘন বিদায়ের সুর বাজছিল। যদিও মেসি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো কঠোর ঘোষণা দেননি, কিন্তু ফুটবল বিশ্লেষকরা মনে করছেন আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির এই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় কার্যত তার সমাপ্তির কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পরিসংখ্যান যেন এক রাজকীয় দলিল:
আর্জেন্টিনার বুয়েনস আইরেস থেকে শুরু করে বাংলাদেশের ঢাকা কিংবা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে মেসির ভক্তদের মধ্যে এখন এক মিশেল আবেগ। একদিকে বিশ্বজয়ের মাধ্যমে মেসির ক্যারিয়ার পূর্ণতা পাওয়ার আনন্দ, অন্যদিকে আর কখনো আর্জেন্টিনার ঐতিহাসিক ১০ নম্বর জার্সিতে তাকে দেখতে না পাওয়ার বেদনা।
বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তিরা বলছেন, "মেসি ছাড়া আর্জেন্টিনা দল আর কখনোই আগের মতো থাকবে না।" বর্তমান কোচ লিওনেল স্কালোনি বহুবার বলেছেন, "মেসি যতক্ষণ খেলতে চাইবেন, ১০ নম্বর জার্সি তার জন্যই বরাদ্দ থাকবে। তবে একদিন আমাদের বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হবে।"
ফুটবল খেলায় অনেক মহান খেলোয়াড় আসবেন এবং যাবেন, কিন্তু লিওনেল মেসি আর্জেন্টিনার জার্সিতে যা রেখে গেলেন, তা কেবল কিছু ট্রফি বা গোল সংখ্যায় মাপা সম্ভব নয়। তিনি একটি পুরো জাতিকে স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছেন, ব্যর্থতার পর কীভাবে ঘুরে দাঁড়াতে হয় তা দেখিয়েছেন।
আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিতে লিওনেল মেসির এই মহাকাব্যিক গল্প হয়তো শেষ হচ্ছে, কিন্তু এই গল্পের প্রতিটি পাতা ফুটবল ইতিহাসের সোনালী অক্ষরে চিরকাল জ্বলজ্বল করবে। ফুটবলের রাজা হয়তো মাঠ ছাড়বেন, কিন্তু তার এই অমর গল্প বেঁচে থাকবে ফুটবলপ্রেমীদের হৃদয়ে চিরকাল।