জাতীয় সংসদে বিল নিয়ে হট্টগোল হলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহকে অসহিষ্ণু না হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘মিস্টার আবদুল্লাহ, এত অসহিষ্ণু হলে চলবে না। এটি শাহবাগ স্কয়ার নয়, সংসদ। আপত্তি থাকলে, নোটিশ দেবেন।’
শুক্রবার মাগরিবের নামাজের পর জাতীয় সংসদের অধিবেশনে সংশোধিত আকারে জুলাই স্মৃতি জাদুঘর বিল পাস নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে বিতর্কের সময় হাসনাত আবদুল্লাহর উদ্দেশে স্পিকার এ কথা বলেন।
সংসদের বিশেষ কমিটিতে যে ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাসের সমঝোতা হয়েছিল, এর একটি ছিল ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশ’। তবে শুক্রবার সংসদে অধ্যাদেশটি বিল হিসেবে উত্থাপনের পর সরকারি দলের এমপি আনিছুর রহমান সংশোধন প্রস্তাব করেন। যা বিরোধীদলের আপত্তির মুখে সরকারি দলের সমর্থনে কণ্ঠভোটে পাস হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর অধ্যাদেশে’ জাদুঘর পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি পদে শিক্ষা, ইতিহাস, সাহিত্য বা সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রথিতযশা একজন বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ দেওয়ার বিধান ছিল। পাস হওয়া সংশোধিত বিল অনুযায়ী, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদাধিকার বলে সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এই অধ্যাদেশ বলেই, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরও বিশেষজ্ঞ হিসেবে পর্ষদের সভাপতি পদে রয়েছেন। বিলটি আইনে পরিণত হওয়ার পর তিনি পদ হারাবেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী সভাপতির দায়িত্ব নেবেন।
সংসদের বিশেষ কমিটির সুপারিশ ছিল অধ্যাদেশটি হুবহু আইনে পরিণত করার।
শুক্রবার স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠকে বিলটি উত্থাপন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
এরপর বিএনপির এমপি আনিছুর রহমান তালুকদার বিলের ৮ (১) ধারা সংশোধনে প্রস্তাব করেন, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী পদাধিকারবলে পর্ষদের সভাপতি হবেন।
অধ্যাদেশের মতো বিলের ৮(২) ধারাতেও বলা হয়েছিল, সভাপতিসহ কয়েকটি পদের মেয়াদ হবে তিন বছর। পরবর্তীতে আবার এক মেয়াদের জন্য নিয়োগ পাওয়ার যোগ্য হবেন। ৮(৩) ধারায় বলা হয়েছিল, পর্ষদের সদস্যরা পদত্যাগ করতে পারবেন।
আনিছুর রহমান ৮(২) ধারা বাতিলের প্রস্তাব করেন। ৮(৩) ধারা সংশোধন করে, পর্ষদের যে কোনো সদস্যকে সরকার অপসারণ করতে পারবে- এ বিধান যুক্ত করার সুপারিশ করেন।
বিরোধীদলের এমপিরা এসব সংশোধনীতে আপত্তি জানান।
স্পিকার বলেন, “বিরোধী দলের সংশোধনী আপত্তি থাকলে তা আগে জানাতে হয়। বিল পাসের পর্যায়ে আপত্তি জানানোর সুযোগ নেই।”
জামায়াতের এমপি ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম আরমান ফ্লোর নিয়ে বলেন, “বিলটি আমরা আগে পায়নি। সংশোধনীর বিষয়েও জানতাম না। তাহলে কীভাবে আপত্তি জানাব?
সরকারদলীয় চিফহুইপ নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “সব মন্ত্রণালয় মন্ত্রী দিয়েই চলে। কাজ মন্ত্রণালয় করবে। তাই, মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বে থাকা উচিত।”
এরপর বিলের সংশোধনী ভোটে দেন স্পিকার। যা কণ্ঠভোটে পাসের পর, স্পিকার মাগরিবের নামাজের বিরোধীদলীয় চিফহুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, বিশেষ কমিটিতে সরকারি এবং বিরোধী দলের হওয়া সমঝোতা ভঙ্গ করে, দুপুরে ছলচাতুরী, জোচ্চুরি করা হয়েছে।
সংস্কৃতিমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে স্পিকার বলেন, “বিশেষ কমিটিতে সমঝোতা হয়েছিল ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাস করা হবে। যে বিলটিতে সংশোধন করা হয়েছে, তাতে সমঝোতা ভঙ্গ হয়েছে।
স্পিকার তখন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের কাছে জানতে চান, সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগ ঠিক কিনা। আইনমন্ত্রী বলেন, “একজন এমপির সংশোধনী দেওয়ার অধিকার আছে। তিনি আধাঘণ্টা আগে সংশোধনী এনেছেন।”
আইনমন্ত্রী বলেন, “অধ্যাদেশে যেভাবে পর্ষদ করা হয়েছে, তাতে কোনো সদস্য যদি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, তাহলে কী হবে? কেউ দুর্নীতি করলে, অধ্যাদেশ অনুযায়ী সরানোর উপায় নেই। তাই ছোট্ট সংশোধনী আনা হয়েছে ৮(৩) ধারায়। বিলটি পাস হয়ে গেছে। চাইলে এই অধিবেশনে বা পরের অধিবেশনে সংশোধন করা যাবে।”
তখন স্পিকার বিরোধীদলকে শান্ত হতে বলেন। কিন্তু এমপিরা হট্টগোল চালিয়ে যান।
সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান তখন বলেন, সমঝোতাকে সম্মান করে সংশোধনী বাদ দিয়ে বিলটি পাস করতে পারত সরকারি দল। সরকার সমঝোতাকে সম্মান করলে, আমরাও সম্মান করব।
সমঝোতা ভঙ্গের অভিযোগ স্বীকার করে এই পর্যায়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন বলেন, “জাদুঘর বিলে একজন এমপি সংশোধনী দিয়েছেন। সরকার দেয়নি।”
এর জবাবে নাহিদ বলেন, “বিরোধীদলের কোনো সংশোধনী তো গ্রহণ করা হয়নি। মন্ত্রী চাইলে, এ সংশোধনী গ্রহণ না করলেও পারতেন।