লাম্পি স্কিন ডিজিজ’ বা এলএসডি, যা গবাদিপশুর জন্য একটি মারাত্মক ভাইরাস, করোনা ভাইরাসের সময়কাল থেকে পরিচিত। মানবজাতির জন্য করোনা যেমন প্রাণঘাতী ছিল, গবাদী পশুর জন্য এলএসডি তেমনই বিপজ্জনক। করোনার প্রকোপ কমলেও, এলএসডি যেন স্থায়ীভাবে কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলাসহ সারাদেশে বাসা বেঁধেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমে এ রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধি পায়। তাই আসন্ন কুরবানী ঈদ উপলক্ষে গরুর বাজারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রাণী সম্পদ কর্মকর্তারা। তারা আক্রান্ত গরুকে হাটে না আনার পরামর্শ দিয়েছেন।
হোসেনপুর উপজেলায় প্রায় ১০টিরও বেশি পশুর হাট রয়েছে, বিশেষ করে হোসেনপুর গরুর হাট, পিতলগঞ্জ গরুর হাট, চরপুমদী গরুর হাট এবং সুরাটী গরুর হাটে গরুর বেচাকেনা হয়। এ কারণে প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তর এসব হাটে লাম্পি স্কিনে আক্রান্ত গরু না নিয়ে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে।
স্থানীয় বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করে জানা গেছে, অসংখ্য গরু এলএসডি দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। এলএসডি গরুর জন্য একটি ভয়ঙ্কর ভাইরাসজনিত চর্মরোগ, যা খামারের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে প্রাণী সম্পদ অফিসের কর্মকর্তারা হতাশ না হয়ে অধিক সচেতনতা ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা নিয়মিত ভ্যাকসিন গ্রহণেরও আহ্বান জানিয়েছেন।
এলএসডি প্রথম ১৯২৯ সালে আফ্রিকার জাম্বিয়াতে দেখা দেয় এবং ১৯৪৩ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে এটি মহাদেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশে গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ প্রথম ২০১৯ সালে চট্টগ্রামে শনাক্ত হয়। তখন প্রাণী সম্পদ অধিদপ্তরের তদন্ত টিম মাঠে নামে এবং দেশের ১২ জেলায় ৪৮ হাজার গরুর মধ্যে এ রোগের লক্ষণ পাওয়া যায়। মশা-মাছির বিস্তারের সময় এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তবে গবাদিপশুর এ রোগে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার কোনো ইতিহাস নেই।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের তথ্যমতে, এলএসডি আক্রান্ত গরুর প্রথমে জ্বর হয় এবং খাবারের প্রতি অনীহা দেখা দেয়। জ্বরের সাথে নাক-মুখ দিয়ে লালা বের হয়, পা ফুলে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে চামড়া পিন্ড আকৃতি ধারণ করে। এ ক্ষত শরীরের অন্যান্য স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ফলে গরুর পানি পানে অনীহা ও খাদ্য গ্রহণ কমে যায়।
মশা-মাছির পাশাপাশি অন্যান্য কীট-পতঙ্গের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়াতে পারে। আক্রান্ত গরুর লালা গরুর খাবারের মাধ্যমে এবং খামার পরিচর্যাকারী ব্যক্তির কাপড়ের মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুতে ছড়িয়ে যেতে পারে। গ্রাম-গঞ্জের প্রাণী চিকিৎসকরা এক সিরিঞ্জ ব্যবহার করে বিভিন্ন গরু ও ছাগলকে টিকা দেয়, যা সিরিঞ্জের মাধ্যমে এক গরু থেকে অন্য গরুতে ভাইরাস ছড়াতে পারে। ভাইরাসে আক্রান্ত ষাঁড়ের সিমেন প্রজননে ব্যবহার করলেও এ রোগ ছড়িয়ে পড়ে। শুধু গরু, মহিষ ও ছাগল এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়।
তবে খামারের ভেতরের এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা হলে মশা-মাছির উপদ্রব কমিয়ে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আক্রান্ত গরুর খামারের শেড থেকে আলাদা করে অন্য স্থানে মশারি দিয়ে ঢেকে রাখলে অন্য গরুতে সংক্রমণ হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। আক্রান্ত গাভির দুধ বাছুরকে খেতে না দিয়ে মাটি চাপা দেওয়া উচিত এবং আক্রান্ত গরুর ব্যবহৃত কোনো জিনিস সুস্থ গরুর কাছে না নিয়ে আসা উচিত।