পবিত্র ঈদুল আজহার উৎসবের মাত্র একদিন বাকি। কোরবানির পশু কেনার পাশাপাশি রান্নাবান্নার বাজারও জমে উঠেছে। খুলনার কাঁচাবাজারগুলোতে এখন অন্যতম আলোচিত পণ্যের নাম—চুইঝাল। স্থানীয়ভাবে ‘চুই’ নামেই পরিচিত এই মসলাটি মাংস রান্নার স্বাদ ও ঘ্রাণে ভিন্নমাত্রা এনে দেয়। তাই ঈদের রান্নায় বাড়তি স্বাদের এই উপাদানটি খুলনার মানুষের রান্নার অন্যতম অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
ঈদ উপলক্ষে খুলনায় চুইঝালের চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। খুলনার বড় বড় কাঁচাবাজার—ময়লাপোতা, গল্লামারী, নিউ মার্কেট, বড় বাজার ও সোনাডাঙ্গায় ঘুরে দেখা গেছে, চুইঝালের দোকানগুলোতে উপচে পড়া ভিড়। বিক্রেতাদের মতে, বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় কোরবানির ঈদের সপ্তাহজুড়ে চুইঝালের চাহিদা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
ময়লাপোতা বাজারের বিক্রেতা রকিবুল ইসলাম রাব্বি জানান, ‘সাধারণ সময়ে দিনে ৪-৫ কেজি চুই বিক্রি হয়, কিন্তু ঈদের কয়েকদিন আগে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এটাই আমাদের আসল মৌসুম। তবে চাহিদা বৃদ্ধির কারণে দামেও কিছুটা পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। সাধারণত আকার ও মানভেদে চুইঝালের কেজি প্রতি দাম ৫০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত হলেও এখন ভালো মানের চুই ৬০০ টাকার নিচে মিলছে না। কিছু জায়গায় এর দাম আরও বেশি।
চুইঝাল শুধু রান্নার স্বাদেই ভিন্নতা আনে না, এটি একটি মূল্যবান ভেষজ উপাদানও। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, এই লতাজাতীয় গাছটির কাণ্ড, শিকড়, পাতা ও ফুল—সব অংশেই রয়েছে নানা ঔষধিগুণ। এতে রয়েছে আইসোফ্লাভোন, পিপালারিটিন, অ্যালকালয়েড, গ্লাইকোসাইডস, পিপলাস্টেরলসহ সুগন্ধি তেল, যা হজমে সহায়তা করে এবং গ্যাস্ট্রিকের উপশমেও কার্যকর।
বিশেষ করে গরু ও হাঁসের মাংস রান্নায় এর কাণ্ড অংশটি বেশি ব্যবহার করা হয়। এর ঝাঁঝালো ঘ্রাণ ও স্বাদ একদিকে যেমন আলাদা রকমের রোমাঞ্চ এনে দেয়, অন্যদিকে খাবারকে করে তোলে স্বাস্থ্যকর।
ঈদের রান্নায় চুইঝাল যেন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। চুইঝাল এখন শুধু খুলনা বা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। দেশের নানা প্রান্তেই এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে। গল্লামারী বাজারের বিক্রেতা আব্দুস সালাম জানান, ‘প্রায় প্রতিটি ক্রেতা অন্তত কিছুটা চুই নিয়েই যাচ্ছেন। চাহিদা দেখে মনে হচ্ছে ঈদের রান্না চুই ছাড়া কল্পনাই করেন না তারা।’
এ বাজারেই দেখা মিলল গৃহিণী হালিমা ইসলামের। হাতে ২০০ টাকার চুইঝাল নিয়ে তিনি বললেন, ‘চুই ছাড়া তো গরুর মাংস জমে না। আমরা প্রতিকেজি মাংসে ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম চুই ব্যবহার করি। এতে মাংস অনেক বেশি সুস্বাদু হয়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ঐতিহ্য ছড়িয়ে পড়ছে দেশজুড়ে। বাগেরহাট, খুলনা, যশোর, নড়াইল ও সাতক্ষীরা—এই অঞ্চলগুলোতে চুইঝাল ঐতিহ্যবাহী মসলা হিসেবে চাষ ও ব্যবহার হয়ে আসছে বহুদিন ধরে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ভোজনরসিকদের মাঝে চুইঝালের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুইঝালের চাষে সম্ভাবনা অনেক, বিশেষ করে যদি আধুনিক পদ্ধতিতে এর উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শুরু করা যায়। এতে একদিকে যেমন চাষিদের আয় বাড়বে, অন্যদিকে দেশের খাদ্য ও ভেষজ শিল্পেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।