বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোতে নতুন কমিটি গঠনের আলোচনা আবারও জোরালো হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়ে চলা এসব সংগঠনের পদপ্রত্যাশীরা এখন অপেক্ষায়—কার ভাগ্যে জুটছে কোন পদ। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে কারা আসছেন, তা নিয়ে চলছে নানা হিসাবনিকাশ ও তৎপরতা। তবে নতুন কমিটি গঠনের কথা থাকলেও এখনো দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না থাকায় অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না পদপ্রত্যাশীদের।
যুবদল ছাড়া প্রায় সবকটি অঙ্গসংগঠনের কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। কোথাও তিন বছর, কোথাও পাঁচ বছর, আবার কোথাও এক যুগেরও বেশি একই কমিটি বহাল। নতুন কমিটি গঠনের আলোচনা থাকলেও দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ দেখছেন না নেতাকর্মীরা। ফলে পদপ্রত্যাশী নেতাদের অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হচ্ছে না। এতে সংগঠনের কার্যক্রমে কার্যত স্থবিরতা নেমে এসেছে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন দলটির নেতাকর্মীরা। অনেকেই মনে করছেন, পুরোনো কমিটি দিয়ে আর সংগঠন গতিশীল রাখা সম্ভব নয়।
দলীয় সূত্র বলছে, বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী ১১টি সংগঠনের মধ্যে ১০টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলীয় গঠনতন্ত্রে প্রতি তিন বছর পর নতুন কমিটি গঠনের বিধান থাকলেও দীর্ঘদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। এতে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত নেতৃত্বের স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাই পদপ্রত্যাশী নেতাকর্মীদের মধ্যেও হতাশা বাড়ছে। বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অঙ্গসংগঠনগুলোর নতুন কমিটি গঠনের বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।
সম্প্রতি বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথকভাবে বৈঠক করে অনানুষ্ঠানিকভাবে তাদের বিদায়ও দিয়েছেন। এতে নতুন করে কমিটি পুনর্গঠনের সম্ভাবনা দেখছেন নেতারা। ফলে সম্ভাব্য নেতৃত্ব নিয়ে নানা হিসাবনিকাশ শুরু হয়েছে। কে সভাপতি হবেন, কে সাধারণ সম্পাদক এবং কারা গুরুত্বপূর্ণ পদে আসবেন, তা নিয়ে পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে আগ্রহের পাশাপাশি রয়েছে তৎপরতাও। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসায় সেই আগ্রহ এখন অনেকটাই অপেক্ষায় পরিণত হয়েছে।
অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের বড় একটি অংশ মনে করছে, নতুন কমিটি হলে সংগঠনে নতুন প্রাণ ফিরবে। দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তা কাটিয়ে মাঠপর্যায়ে নেতাকর্মীদের সক্রিয় করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে তৃণমূলের সঙ্গে কেন্দ্রের দূরত্বও কমবে। দীর্ঘ সময় কমিটি না হওয়ায় পদপ্রত্যাশীদের অনেকেই নিজেদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড গুটিয়ে নিয়েছেন। আবার কেউ এখনো কেন্দ্রের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করছেন, নতুন কমিটি নিয়ে দীর্ঘসূত্রতায় তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে।
অবশ্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ মঙ্গলবার বলেন, শিগ্গিরই অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর নতুন কমিটি আসবে। পুনর্গঠনের কার্যক্রম চলছে।
জাতীয়তাবাদী যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতী দল, মৎস্যজীবী দল, মুক্তিযোদ্ধা দল, জাসাস ও ওলামা দল-এই ৯টি হলো বিএনপির অঙ্গসংগঠন। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও শ্রমিক দল বিএনপির সহযোগী সংগঠন। তবে এসব সংগঠনের অধিকাংশেরই পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র নেই। ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ গঠনতন্ত্র ৪৮ বছরেও তৈরি হয়নি। ফলে মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোই দীর্ঘদিন ধরে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছে। বিএনপির প্রধান যুব অঙ্গসংগঠন জাতীয়তাবাদী যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে। এতে আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি এবং নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। চলতি বছরের ৪ জুন ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হয়। এর মধ্যে সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন বর্তমানে সংসদ-সদস্য।
২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এসএম জিলানীকে সভাপতি এবং রাজীব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ তিন বছর। সে হিসাবে গত বছরের সেপ্টেম্বরে কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। তবে এ সময়ের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। যদিও সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক দুজনই সংসদ-সদস্য। রাজীব আহসান বর্তমানে সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ওপর সরকারি দায়িত্ব বেড়ে যাওয়ায় আগের মতো সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও নতুন নেতৃত্ব নিয়ে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে।
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে হাসান জাফির তুহিনকে সভাপতি এবং শহিদুল ইসলাম বাবুলকে সাধারণ সম্পাদক করে কৃষক দলের কমিটি গঠন করা হয়। তিন বছর মেয়াদি এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে দুই বছর আগে। শহিদুল ইসলাম ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সংসদ-সদস্য। হাসান জাফির তুহিনও সরকারের একটি প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৪ সালের মার্চে রাকিবুল ইসলাম রাকিবকে সভাপতি ও নাছির উদ্দিন নাছিরকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ঘোষণা করা হয়। এই কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ফেব্রুয়ারিতে।
ফলে সংগঠনটি পুনর্গঠনের দাবি উঠেছে অনেক আগেই। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতানা আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে মহিলা দলের কমিটি ঘোষণা করা হয়। দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও ১০ বছর ধরে একই কমিটি দিয়ে চলছে। ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে মুক্তিযোদ্ধা দলের কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে ইশতিয়াক আজিজ উলফাত সভাপতি ও সাদেক খান সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান।
এরপর এক যুগেরও বেশি অতিবাহিত হলেও নতুন কমিটি আর হয়নি। ২০১৪ সালের এপ্রিলে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলে আনোয়ার হোসাইন ও নূরুল ইসলাম খান নাসিমের নেতৃত্বে সংগঠনটির কমিটি গঠিত হয়। ২০১৬ সালে কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে আর কোনো কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে রফিকুল ইসলাম মাহতাবকে আহ্বায়ক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা আব্দুর রহিমকে সদস্যসচিব করে মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টে মারা যান রফিকুল ইসলাম। ওই বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর সংগঠনটির কমিটি বিলুপ্ত করা হলেও আর কোনো কমিটি হয়নি। খোঁজ নিয়ে অন্যান্য অঙ্গসংগঠনের ক্ষেত্রেও প্রায় একই অবস্থার কথা জানা গেছে।
স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘আমরা সবাই নতুন কমিটির অপেক্ষা করছি। তবে কমিটি পুনর্গঠনের বিষয়টি দীর্ঘ হয়ে যাচ্ছে। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলকে সুসংগঠিত ও সংগঠনকে গতিশীল করতে দ্রুত কমিটির প্রয়োজন।’
তৃণমূলের নেতাকর্মীদের দাবি, অঙ্গসংগঠনগুলোকে সক্রিয় করতে দ্রুত মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি দেওয়া প্রয়োজন। সম্মেলনের মাধ্যমে যোগ্য, ত্যাগী ও সক্রিয় নেতাদের নেতৃত্বে আনার কথাও বলেছেন কেউ কেউ।
তাদের মতে, ক্ষমতাসীন দলের জন্য সাংগঠনিক শক্তি ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দল কিংবা ক্ষমতার বাইরে থাকাকালে আন্দোলন ও কর্মসূচির মাধ্যমে নেতাকর্মীদের সক্রিয় রাখা যায়। কিন্তু ক্ষমতায় থাকার সময় সংগঠনের নিয়মিত কর্মকাণ্ড চালু না থাকলে নেতাকর্মীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হতে পারে।