সাকিব আল হাসানের দেশে ফেরা এবং ঘরের মাঠে তার ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলা নিয়ে জল্পনা যেন থামছেই না। এর কারণও সবার জানা- তা হলো, নিরাপত্তা। একে তো তিনি ছিলেন ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকারের সংসদ সদস্য, তারপর হয়েছেন হত্যা মামলার আসামী। দুইয়ে মিলে তৈরি হয় তাকে নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কা।
ভারতের বিপক্ষে কানপুর টেস্ট শুরুর আগেই শর্তজুড়ে অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন সাকিব আল হাসান। বাংলাদেশি অলরাউন্ডার জানিয়েছিলেন, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা পেলে দেশে আরেকটি টেস্ট খেলতে চান। পরে সাকিবের অবসর ইস্যু গড়ায় অনেক দূর। ধারণা করা হচ্ছিল, কানপুরেই ক্যারিয়ারের শেষ টেস্ট খেলে ফেলেছেন টাইগার পোস্টারবয়। তবে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ দুদিন আগে সাকিবের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন। তাতেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে দেশের মাটিতে সাকিবের টেস্ট থেকে অবসরের বিষয়টি।
তার এই স্বপ্ন পূরণে বাধা রাজনৈতিক একটি মামলা।
মোহাম্মদপুর থানার একটি মামলায় আসামি করা হয়েছে আওয়ামী লীগের টিকিট নিয়ে মাগুরা-১ আসন থেকে সবশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি হওয়া সাকিবকে। সেই মামলায় গ্রেফতার হওয়ার আতঙ্কে দেশে ফেরা নিয়ে দুশিন্তায় আছেন সাকিব।
ছাত্র-জনতার অভ্যুথানে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশে ফেরেননি সাকিব। আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য হওয়ায় তার নামে একটি হত্যা মামলা হয়। এ সময় তিনি ছিলেন নিউইয়র্কে পরিবারের সঙ্গে। সেখান থেকেই পাকিস্তানে গিয়ে খেলেন দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ। এরপর সতীর্থরা দেশে ফিরলেও সাকিব কাউন্টিতে একটি ম্যাচ খেলতে যান ইংল্যান্ডে। সেখান থেকেই ভারতে গিয়েই বিদায়ের দিনক্ষণ জানিয়ে দেন। তবে ক্রীড়া উপদেষ্টার বক্তব্যের পর দেশে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তার শেষ টেস্ট খেলার সম্ভাবনা জেগেছে।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর অবসরের ঘোষণায় সাকিব বলেছিলেন, ‘মিরপুর টেস্টে (দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে) খেলতে পারলে সেটি হবে আমার শেষ টেস্ট।’ এর জন্য অবশ্য নিরাপত্তা চেয়েছিলেন, ‘আমি যেন গিয়ে খেলতে পারি এবং নিরাপদ অনুভব করি। যখন দেশের বাইরে আসার দরকার হবে, দেশের বাইরে আসতে পারি। তারা (বোর্ড) হয়তো আমাকে একটা সিদ্ধান্ত দেবে, যেটার ভিত্তিতে আমি দেশে গিয়ে খুব ভালোভাবে খেলে অন্তত টেস্ট ফরম্যাটটা ছাড়তে পারব।’
কিন্তু সাকিবের নিরাপত্তা এবং ঠিকঠাক দেশের বাইরে যেতে পারা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের কেউই ইতিবাচক কথা বলেননি। সাকিবের অবসরের ঘোষণার পরিপ্রেক্ষিতে বিসিবি সভাপতি ফারুক আহমেদ সাফ বলে দিয়েছেন, সাকিবকে নিরাপত্তা দেওয়া বিসিবির পক্ষে সম্ভব নয়। এই বিষয়ে তিনি বল ঠেলে দেন সরকারের দিকে। যদিও ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেছিলেন, সাকিব দেশে ফিরলে একজন খেলোয়াড় হিসেবে সম্ভাব্য সব রকম নিরাপত্তা দেওয়া হবে। তবে সঙ্গে এ-ও বলেছেন, মানুষের মনের ক্ষোভ দূর করার উদ্যোগ সাকিবকেই নিতে হবে। সাকিবকে তার রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করারও পরামর্শ দেন তিনি। দেশে সাকিবের শেষ টেস্ট খেলা নিয়ে এত কথা হতে থাকলেও অবসর ঘোষণার পর সাকিব এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত একেবারেই নিশ্চুপ আছেন।
গত বৃহস্পতিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে ক্রীড়া উপদেষ্টা বলেন-
‘তিনি (সাকিব) বাংলাদেশে নিজের শেষ টেস্ট খেলতে চান, আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই সেই সুযোগ তিনি পান।’ দেশে এলে সাকিবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের একজন খেলোয়াড়কে অবশ্যই আমরা সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেব। আমরা সাকিব আল হাসানের নিরাপত্তার কথা এরই মধ্যে বলেছি, সেটা আমরা নিশ্চিত করব।’কারও বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকলে, সেটা ভিন্ন বিষয়। সেই বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারি না, কারণ সেটা আইন মন্ত্রণালয়ের বিষয়। আমরা সাকিব আল হাসানের নিরাপত্তার কথা এরইমধ্যে বলেছি, সেটা আমরা নিশ্চিত করব।”

এদিকে বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে দুই টেস্টের দল নির্বাচনের ব্যাপারে গাজী আশরাফ হোসেনের নির্বাচক কমিটির প্রতি সাকিবকে নিয়ে বিসিবির শীর্ষ পর্যায় থেকে এখন পর্যন্ত বিশেষ কোনো বার্তা নেই। নির্বাচক কমিটি তাই ক্রিকেটীয় বিবেচনায় সাকিবকে রেখেই দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের দল গঠন করবে বলে জানা গেছে। তাই ঘরের মাঠে সাকিবের বিদায়ের আশা আপাতত করতেই পারেন দেশের আপামর ক্রিকেটপ্রেমীরা।