কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৩ কিলোমিটার অংশে তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। সাগরের জোয়ারের ঢেউয়ের আঘাতে সড়কটির অন্তত ১০টি স্থান লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। ঝুঁকির কারণে আপাতত সড়কের এই অংশে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এদিকে লবণাক্ত পানিতে কৃষিজমি ও ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা। প্রাথমিকভাবে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিগ্রেড জিও ব্যাগ দিয়ে রক্ষার চেষ্টা চালালেও স্থায়ী সমাধানে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের।
সরেজমিন দেখা যায়, সাগরের উত্তাল জোয়ারে লণ্ডভণ্ড কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের অন্তত ৩ কিলোমিটার অংশ। ভাটার সময় ক্ষত-বিক্ষত মেরিন ড্রাইভের দৃশ্য ভেসে উঠছে।
দেখা যাচ্ছে, পিচঢালা সড়ক ভেঙে পড়েছে কোথাও, কোথাও আবার ঢুকে পড়েছে সাগরের পানি। প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে টেকনাফ জিরো পয়েন্ট থেকে শিশুপার্ক পর্যন্ত সড়কটির অন্তত ১০টি স্থান ক্ষতিগ্রস্ত। যেখানে তীব্র ভাঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত।
এদিকে ভাঙনের ঝুঁকিতে বন্ধ রাখা হয়েছে ৩ কিলোমিটার অংশে যান চলাচল। ফলে বিপাকে পড়েছেন সাবরাং ও শাহপরীর দ্বীপগামী মানুষ। হতাশ মেরিন ড্রাইভ ভ্রমণে আসা পর্যটকরাও।
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক মোহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, মূলত মেরিন ড্রাইভের সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক পর্যন্ত যাওয়ার জন্য পাঁচ বন্ধু মিলে প্রাইভেটকার নিয়ে টেকনাফ আসি। এখন দেখি রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই কোনো যানবাহন যেতে দিচ্ছে না। এ কারণে মন খারাপ করে চলে যাচ্ছি।
শাহপরীর দ্বীপ এলাকার ইজিবাইক মোহাম্মদ রশিদ বলেন, মেরিন ড্রাইভ ভেঙ্গে গেছে। যে কারণে রাস্তা ঝুঁকিপূর্ণ। এখন সেনাবাহিনী যানবাহন চলাচল সামরিক বন্ধ রেখেছে। এতে আমরা যেমন কষ্ট পাচ্ছি, ঠিক তেমনি যাত্রীরাও কষ্ট পাচ্ছে। তবে সেনাবাহিনী দ্রুত কাজ করছে দেখা যাচ্ছে।
ভাঙন কবলিত মেরিন ড্রাইভের বিপরীতে রয়েছে ২০টি গ্রাম। চাষাবাদ হয়েছে কয়েক হাজার একর জমিতে। তাই সাগরের লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়লে ফসলের বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে এবং ঘরবাড়ি প্লাবিত হওয়ার শঙ্কায় আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. শফিক বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত মেরিন ড্রাইভের পুরো অংশ ভেঙ্গে গেলে আমাদের অবস্থা তো খুবই খারাপ হবে। আমরা তো কৃষক, কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। এখন যদি সাগরের নোনা পানি কৃষি জমিতে চলে আসে তাহলে তো আমাদের সব কিছু শেষ হয়ে যাবে।’
আরেক বাসিন্দা ফরিদুল আলম বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা খুবই আতংকে আছি। কারণ সাগর উত্তাল, ঢেউয়ের তোড়ে মেরিন ড্রাইভ খুব বেশি ভাঙছে। যার কারণে আমরাও ঝুঁকি মধ্যে আছি। মেরিন ড্রাইভের কাছেই আমার বাড়ি। এখন যদি রাতে মেরিন ড্রাইভ ভেঙ্গে পানি ঢুকে তাহলে ঘরবাড়ি সব তলিয়ে যাবে। এক প্রকার মহাবিপদের মধ্যে আছি।’
প্রাথমিকভাবে ভাঙন রোধে কাজ করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন বিগ্রেড। জিও ব্যাগ ফেলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ রক্ষা করার চেষ্টা চলছে।
সরেজমিন দেখা যায়, মেরিন ড্রাইভের টেকনাফ শিশু পার্ক এলাকায় বাঁশ এবং সাইনবোর্ড দিয়ে ব্যারিকেড দেয়া হয়। সাইনবোর্ডে ‘ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, যানবাহন চলাচল সাময়িকভাবে বন্ধ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী’ লেখা রয়েছে।
আর ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে সেনাবাহিনী সদস্য দাঁড়িয়ে দায়িত্বপালন করছেন। আর যেসব স্থানে ভাঙন তীব্র হয়েছে, সেসব স্থানে ট্রাকে করে মাটি ফেলা হচ্ছে। আবার অনেক স্থানে জিও ব্যাগে মাটি ভর্তি করে বাঁধ দেয়া হচ্ছে।
আর শ্রমিকদের যেন ব্যস্ততার শেষ নেই। কেউ ইট বিছানোর কাজ করছে কেউবা পাইপ নিয়ে কাজ করছেন। এসব পুরো কাজ তদারকি করছেন সেনাবাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
মেরিন ড্রাইভে ভাঙন এবারই প্রথম নয়। তবে প্রতিবারই ভাঙনের পর সাময়িক ব্যবস্থা নেয়া হয়। স্থায়ী টেকসই পদক্ষেপ না নিলে এই সড়ক রক্ষা করা যাবে না বলে দাবি স্থানীয় জনপ্রতিনিধির।
টেকনাফ সাবরাং ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘সাগরের আগ্রাসন থেকে মেরিন ড্রাইভকে রক্ষায় শুধুমাত্র জিও ব্যাগ দিয়ে চেষ্টা করলে তা ভুল হবে। এই মেরিন ড্রাইভকে রক্ষায় টেকসহ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দেখা যাচ্ছে, এখানে বরাদ্দে সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে টেকনাফের শিশুপার্ক থেকে শুরু করে সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক পর্যন্ত মেরিন ড্রাইভ বিলীন হয়ে যাবে। মেরিন ড্রাইভ বিলীনের সঙ্গে সঙ্গে এখানকার ২০টি গ্রাম, কয়েক হাজার একর কৃষি জমি ও সুপারি বাগান লবণাক্ত পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যাবে।’
দেশের দীর্ঘতম মেরিন ড্রাইভ শুধু পর্যটনের জন্য নয়, সীমান্ত এলাকার সাথে যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই দ্রুত সময়ের মধ্যে টেকসই ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। মোহাম্মদ সেলিম বলেন, ‘বর্তমান অর্ন্তবর্তী সরকারের অনুরোধ করছি, পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ দিয়ে মেরিন ড্রাইভ টেকসহ করাসহ টেকনাফবাসীকে সুরক্ষা দেয়ার জন্য।’