ঢাকার মিরপুর মডেল থানা–সংলগ্ন মিরপুর শপিং কমপ্লেক্সের সামনে ৫ আগস্ট গুলিতে আহত হয়ে পরে মারা যায় রিতা আক্তার (১৭)।
এ ঘটনায় করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও পুলিশসহ ৩৯৫ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে মিরপুর-১ নম্বরের মুক্তবাংলা শপিং কমপ্লেক্সের ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিন ও শাহ আলী থানার ডি ব্লকের বাসিন্দা কাজী জয়নালের নামও রয়েছে।
ব্যবসায়ী আফরোজ উদ্দিনের দাবি, তাঁকে ফাঁসানো হয় তাঁর ভাইয়ের হত্যা মামলা তুলে না নেওয়ার কারণে। তিনি বলেন, ২০০৫ সালে চাঁদার জন্য শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদতের নেতৃত্বে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীরা তাঁর বড় ভাই ব্যবসায়ী আফতাব উদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে। ভাইয়ের হত্যা মামলার আসামিরাই তাঁকে রিতা হত্যা মামলায় ফাঁসিয়েছে।
মামলার বাদী রিতার বাবা মো. আশরাফ আলী। তিনি পেশায় রিকশাচালক। থাকেন মিরপুর–২ নম্বর সেকশনে। গ্রামের বাড়ি জয়পুরহাটের কালাইয়ে। তিনি বলেন, বিএনপির লোকেরা থানায় ছিলেন। তাঁরা আসামির তালিকা ঠিক করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘আমাকে সই করতে বলেছে, তখন আমি সই করেছি। আসামি যে কতজন হয়েছে, তা আমি সঠিকভাবে বলতে পারব না।’
আসামির তালিকায় থাকা আফরোজ ও কাজী জয়নালকে চেনেন কি না, আশরাফ বলেন,
‘আমি চিনব কীভাবে। বিএনপির লোকজন আমাকে কিছু টাকাপয়সা দিছিল, তারাই তো মামলায় নাম ঢুকাইছে। ভালো–মন্দ সবাই মামলায় ঢুইক্যা গ্যাছে। হামি সাক্ষ্য দিয়ে নির্দোষ লোকদের বাঁচাতে চাই।’
থাকেন কক্সবাজারে, আসামি ঢাকার মামলায়
মিরপুর-১০ নম্বরের শাহ আলী প্লাজা এলাকায় গত ৪ আগস্ট গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইকরামুল হক। ৭ সেপ্টেম্বর ইকরামুলের বাবা মো. জিয়াউল হক বাদী হয়ে ৭৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেন, যার মধ্যে চারজন কক্সবাজারের বাসিন্দা। তাঁরা হলেন মিজানুর রহমান মাতবর, তাঁর চাচাতো ভাই জিয়াউর রহমান এবং তাঁদের ভাতিজা মো. কামাল ও নাজমুল হোসাইন সিদ্দিকী।
মিজানুর রহমান ও জিয়াউর রহমান দাবি করেন, তাঁরা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। এ কারণে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তারেক বিন সিদ্দিকী ১৬ বছর আগে তাঁদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দিয়ে এলাকাছাড়া করেন। তাঁরা কক্সবাজারেই অন্য এলাকায় থাকেন। কখনো ঢাকায় থাকেননি। তাঁদের ভাষ্য, আওয়ামী লীগ নেতা তারেক বিন সিদ্দিক বাদী জিয়াউল হককে দিয়ে কাফরুল থানার হত্যা মামলায় তাঁদের আসামি করিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মো. জিয়াউল হক বলেন, ‘আমি কিছুই বলব না।’

মিরপুর–১০ নম্বরে ১৮ জুলাই নিহত হন সিয়াম সরদার। এই ঘটনায় করা মামলায় অন্যান্যদের সঙ্গে আসামি করা হয়েছে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সহসভাপতি সৈয়দ দেলোয়ার হোসেনকেও। তিনি বলেন, রাজনীতিতে তাঁকে পিছিয়ে রাখতে নিজ দলেরই কেউ তাঁর নাম আসামির তালিকায় দিয়েছে।
ধানমন্ডিতে ১৯ জুলাই নিহত হন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মো. শুভ। এ মামলায় আসামি করা হয়েছে ঘটনার আগে থেকে (২৮ জুন থেকে) অস্ট্রেলিয়ায় থাকা মিজানুর রহমান নামের এক ব্যবসায়ীকে। কী কারণে তাঁকে আসামি করা হলো, তা তাঁর স্বজনেরা বুঝতে পারছেন না।
মিরপুর–১০ নম্বরে ১৯ জুলাই গুলিবিদ্ধ হয়ে আসিফ ইকবাল নিহত হওয়ার ঘটনায় করা মামলায় আসামি করা হয় ব্যবসায়ী মো. জালালকে। তিনি দাবি করেন, মিরপুরে একটি বিপণিবিতানের কমিটির বিরোধকে কেন্দ্র তাঁকে ফাঁসানোর চেষ্টা হচ্ছে।
এভাবে আসামি করার উদাহরণ আরও আছে। হত্যা মামলায় আসামি করা হলে সহজে জামিন পাওয়া যায় না। তাই আসামিদের গ্রেপ্তারের আগে সঠিক তদন্তের ওপর জোর দেন ঢাকা মহানগর পুলিশের সাবেক কমিশনার নাইম আহমেদ।
‘শত্রুতামূলক মামলা’
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে ৭৬৬ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এসব ঘটনায় ঢাকাসহ জেলায় জেলায় মামলা হচ্ছে। একেক মামলায় শত শত ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এখনো মামলা করা হচ্ছে। ঢাকার আশপাশের শিল্প এলাকায় কোনো কোনো মামলায় আসামি করা হয়েছে রাজনীতিতে যুক্ত না থাকা ব্যবসায়ীদেরও। কোনো কোনো মামলায় আসামি করা হয়েছে সাংবাদিক, শিল্পী, খেলোয়াড় ও নাগরিক আন্দোলনকর্মীসহ নানা পেশার মানুষকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করার উদ্দেশ্য চাঁদাবাজি। আর ‘ফ্যাসিবাদীদের’ ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনসহ যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা না নিয়ে হত্যা মামলায় নাম ঢুকিয়ে মামলাগুলোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।
বিএনপির নেতা-কর্মীরা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘গায়েবি’ মামলায় ভুক্তভোগী। তখন গায়েবি মামলা নিয়ে নাগরিক সমাজ ও দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো প্রশ্ন তুলেছিল।
এখন নতুন প্রবণতা ‘ইচ্ছেমতো’ আসামি করা। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না বলেন, শত্রুতামূলক ও হয়রানি করতে যে এসব মামলা করা হচ্ছে, এটা বুঝতে বিশেষজ্ঞ হওয়া লাগে না।