ঝুলে থাকা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া আবার শুরু হবে বলে আশা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার৷ রাখাইনে মানবিক সহায়তা পাঠাতে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে একটি চ্যানেল তৈরির আলোচনা হচ্ছে, যা প্রক্রিয়াটিকে সহায়তা করতে পারে৷
প্রধান উপদেষ্টা রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে বলেন, ‘‘এই ঈদে না হোক, আগামী রোজার ঈদ যেন আপনারা নিজ মাতৃভূমিতে স্বজনদের সঙ্গে উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে আমরা সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি৷”
শুক্রবার বাংলাদেশ সফররত জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে নিয়ে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়ে এসব কথা বলেন তিনি৷
প্রধান উপদেষ্টার এই বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিষয়টি৷ তবে কি নতুন কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে? প্রধান উপদেষ্টা হঠাৎ করে নির্দিষ্ট দিনক্ষণ ধরেই কেন এমন বক্তব্য দিলেন?–এমন প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে সংশ্লিষ্টদের মনে৷
বিষয়টি নিয়ে প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয়াবলী সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. খলিলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে ডয়চে ভেলে৷ লিখিত বক্তব্যে তিনি জানিয়েছেন, ‘‘জাতিসংঘ থেকে আবারও যে প্রতিশ্রুতি এসেছে এবং মিয়ানমারের বর্তমান উদ্ভুত পরিস্থিতিতে রোহিঙ্গা সংকটের একটি টেকসই সমাধানের সুযোগ এসেছে বলে প্রতীয়মান হয়৷ এই প্রেক্ষিতে আমাদের সকলকে একসঙ্গে কাজ করার জন্য প্রধান উপদেষ্টা উৎসাহমূলক সময়ের কথা উল্লেখ করেছেন৷”
তবে কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী বিষয়টিকে এতটা সরলভাবে দেখতে চান না৷ ডয়চে ভেলেকে তিনি বলেন, ‘‘এগুলো জনপ্রিয় বক্তব্য৷ এমন বক্তব্য দেয়া সহজ৷ কিন্তু বাস্তবতা হলো রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে এখন কোনো উদ্যোগই নেই৷ প্রধান উপদেষ্টা তো আগামী রোজার কথা বলেছেন, বাস্তবে আগামী ১০ বছরেও সেটা সম্ভব কিনা তা নিয়ে আমার কাছে প্রশ্ন আছে৷”
তিনি আরো বলেন, ‘‘ধরেন কাল থেকেই প্রত্যাবাসন শুরু হলো, প্রতি মাসে ১০ হাজার জন যাবেন৷ ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে পাঠাতে কত বছর লাগবে? আর আরাকানে রোহিঙ্গাদের যে বসতবাড়ি ছিল সেগুলো তো গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে৷ বানানো হচ্ছে ইকনোমিক জোন৷ এই প্রত্যাবাসের সঙ্গে জিও পলিটিক্স জড়িত৷ চীন ও মিয়ানমারকে রাজি করাতে হবে৷ পাশাপাশি আরাকান এখন বিদ্রোহীদের দখলে৷ ফলে তাদেরও সম্মতি প্রয়োজন৷ ফলে আমার মনে হয়েছে প্রধান উপদেষ্টা পপুলিস্ট বক্তব্য দিয়েছেন৷”
বাংলাদেশে সফরে আসার পরদিন শুক্রবার কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে দেখা করতে যান জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস৷ তার সঙ্গে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস৷ তারা অংশ নিয়েছেন এক লাখ রোহিঙ্গার সঙ্গে সলিডারিটি ইফতারে৷ কক্সবাজারের উখিয়ার বালুখালি ক্যাম্প ঘুরে রোহিঙ্গাদের খোঁজ খবর নিয়েছেন আন্তোনিও গুতেরেস৷
জাতিসংঘ মহাসচিব সেখানে সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘রোহিঙ্গাদের বিষয়ে একমাত্র সমাধান তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবাসন৷” তবে এই মুহূর্তে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতিতে প্রত্যাবাসন কতটা সম্ভব, সেটি নিয়েও উদ্বেগ জানান তিনি৷
আট বছর আগে মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে কোনোরকমে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছেন রোহিঙ্গারা৷ আট বছরে বহুবার তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করেছে বাংলাদেশ৷ কিন্তু সম্ভব হয়নি৷
জাতিসংঘ মহাসচিব এবং প্রধান উপদেষ্টার ইফতারে অংশ নেওয়া রোহিঙ্গারা তাদের ওপর গণহত্যা বন্ধ করা ও তাদেরকে নিজ দেশে ফেরানোর দাবি জানান৷ পরে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় রোহিঙ্গাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেন৷ সেখানে তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের কীভাবে দ্রুত তাদের দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করা যায়, সে ব্যাপারে গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার৷
উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা আবু মুসা ডয়চে ভেলেকে বলেন, ‘‘প্রত্যাবাসন নিয়ে আমরা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম৷ কিন্তু প্রধান উপদেষ্টার বক্তব্যের পর আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে৷ আমরা আশা করছি, উনি যখন একটা ডেটলাইন দিয়েছেন, ফলে এই সময়ে মধ্যে একটা পরিস্থিতি তৈরি হবে৷”
আগামী সেপ্টেম্বরে রোহিঙ্গাদের নিয়ে একটা আন্তর্জাতিক সম্মেলন হওয়ার কথাও জানানলেন তিনি৷ বলেন, ‘‘সেখানেও বিশ্ব নেতৃবৃন্দ প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে মিয়ানমারকে চাপ দেবে বলে আশা করছি৷”
জাতিসংঘ মহাসচিব রোহিঙ্গা লার্নিং সেন্টার ও রোহিঙ্গা কালচারাল সেন্টার পরিদর্শন করেন৷ সেখানে রোহিঙ্গাদের সংস্কৃতি ও জীবন যাপন সম্পর্কে ধারণা নেন৷ পাশাপাশি কিছু রোহিঙ্গা তরুণের সঙ্গে কথাও বলেন৷ সেখানে মনোযোগ দিয়ে শুনেন শরনার্থী শিবিরের নারী ও শিশুদের কথাও৷ গুতেরেস আশ্রয় শিবিরের কয়েকটি রোহিঙ্গা পরিবারের কাছে গিয়ে তাদের খোঁজখবর নেন৷তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেন৷ এসব জায়গায় রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যারা জাতিসংঘ মহাসচিবকে পেয়েছিলেন তারা অনেকেই তাদের দুঃখ দুর্দশার কথা তুলে ধরেন৷