
কৃষকের জীবন মানেই এক অসীম সংগ্রামের গল্প। প্রাতঃসূর্যের আলো যখন ভোরের কুয়াশা চিরে পলিমাটির ওপর ছড়িয়ে পড়ে, তখন শুরু হয় এক নতুন বেঁচে থাকার লড়াই। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে যে মাটি প্রস্তুত করা হয়েছিল, তা আজ বাতাসে দোল খাওয়া সবুজ ও সোনালী ধানের শীষে ভরপুর। রোদের ঝিলিক যখন সেই ধানের গাছে পড়ে, কৃষকের মনে তখন ফুটে ওঠে অনাবিল হাসির ঝলকানি।
এই একখণ্ড ধান খেত কেবল যে কিছু অন্ন বা শস্যের যোগান দেয়—তা কিন্তু নয়। এই জমির বুকে জমে থাকে হাজারো পরিবারের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন, সন্তানের পড়ার খরচ, মেয়ের বিয়ের আকুতি, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধের দাম আর বছরের বাকি দিনগুলো খেয়ে-পরে বাঁচার আকুল মিনতি। কিন্তু প্রকৃতি যখন তার রুদ্র রূপ ধারণ করে, তখন চোখের পলকে সেই পরম মায়ায় গড়ে তোলা সোনার সংসার তছনছ হয়ে যায়।
১. গর্জে ওঠা নদী এবং প্রথম ভাঙনের আঘাত
পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা কিংবা ব্রহ্মপুত্রের মতো প্রমত্তা নদীগুলোর পার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রামগুলোতে প্রাত্যহিক শান্তির আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। পানির স্রোত যখন তীরে এসে আছড়ে পড়ে, তখন মাটির নিচ থেকে ভেসে আসে এক অদ্ভুত সুড়সুড় শব্দ। পানির তলার পলি আর মাটি ধসে পড়তে শুরু করে।
হঠাৎ করেই শান্ত পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। তীরের মাটি সামান্য কেঁপে ওঠে। আর অমনি প্রকট ফাটল দেখা দেয় সবুজ ধানি জমির বুকে। নদী যেন এক ক্ষুধার্ত দানব! তার পাড় ভাঙার বিকট শব্দে থমকে দাঁড়ায় চারপাশের পরিবেশ। চোখের সামনেই ফাটলগুলো বড় হতে থাকে। কয়েক একর ধান খেত, যেখানে একটু আগেও বাতাসের সুবাস ছিল, তা এক ধাক্কায় সোজা নেমে যায় নদীর হাঁ করা পেটের ভিতর!
২. "মুহূর্তেই শেষ!": এক নিমেষে বিলীন হওয়া স্বপ্নের প্রান্তর
চোখের পলক ফেলার আগেই বিঘার পর বিঘা ধান খেত ভাঙনের তোড়ে ধসে পড়ে। পারের মাটি ধসে পড়ার পর গুমগুম শব্দে যখন পানির তোড় লাফিয়ে ওঠে, তখন কৃষকের পায়ের নিচের মাটিও যেন সরে যায়। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে অসহায় কৃষক দেখে—তার চোখের সামনেই আছড়ে পড়ছে বিশাল মাটি আর সাথে তলিয়ে যাচ্ছে সদ্য শীষ আসা ধানের গাছ।
পানির স্রোতে ভেসে যায় সোনালী স্বপ্ন। ধান গাছগুলো জলের তোড়ে হাবুডুবু খেতে খেতে নদীর খরস্রোতা স্রোতে কোথায় যে হারিয়ে যায়! কয়েক সেকেন্ড আগেও যে স্থানটি ছিল শক্ত উর্বর জমি, সেখানে এখন শুধু অথৈ জল আর প্রমত্তা ঘূর্ণিস্রোত। কোনো প্রতিরোধ কাজ করে না, কোনো চেষ্টা মাটি আঁকড়ে রাখতে পারে না। নদীর এই নিষ্ঠুর গ্রাস দেখে বাক্যহারা হয়ে পড়ে মানুষ।