প্রচ্ছদ সর্বশেষ ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?

ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?

এই বিশৃঙ্খলার অবসান কবে? কবে ফিরে আসবে নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার: “ফুটপাত”?

দ্বারা নিজস্ব প্রতিনিধি
০ কমেন্ট 3 মিনিট পড়ুন
ফুটপাত
ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?

ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তাগুলোতে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ মানুষ চলাফেরা করেন। অফিসগামী কর্মজীবী থেকে শুরু করে স্কুলগামী শিক্ষার্থী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা থেকে শুরু করে গৃহিণী—সবার যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম হচ্ছে ফুটপাত। কিন্তু এই ফুটপাত যে জনসাধারণের হাঁটার জন্য তৈরি, সেটাই যেন হারিয়ে গেছে বর্তমান বাস্তবতায়। অসংখ্য অবৈধ দখলদার, হকার, ব্যবসায়ী, এমনকি নির্মাণ সামগ্রী জমিয়ে রাখা হয়েছে অনেক জায়গায়—ফলে পথচারীদের হাঁটা তো দূরের কথা, স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ানোও দায় হয়ে উঠেছে।

প্রশ্ন উঠছে—এই বিশৃঙ্খলার অবসান কবে? কবে ফিরে আসবে নাগরিকদের ন্যায্য অধিকার: “ফুটপাত”?


ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?
ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে? 10

এক সময়কার হাঁটার পথ, এখন দখলের রাজত্ব

রাজধানীর ধানমন্ডি, গুলিস্তান, ফার্মগেট, মিরপুর, নিউমার্কেট, কারওয়ান বাজার সহ প্রায় সব জনবহুল এলাকাতেই ফুটপাত দখলের চিত্র একই রকম। সকাল হলেই শুরু হয় হকারদের দোকান বসানোর প্রতিযোগিতা। কেউ কাপড় বিক্রি করেন, কেউ মোবাইলের এক্সেসরিজ, আবার কেউ বসিয়ে ফেলেন টেম্পরারি খাবারের দোকান। ফুটপাত যেন রীতিমতো “অস্থায়ী বাজারে” রূপ নিয়েছে।

এ প্রসঙ্গে মতিঝিল এলাকার বাসিন্দা শামসুল ইসলাম বলেন,

“আমরা যারা বাসা থেকে হেঁটে অফিসে যাই, আমাদের ফুটপাত দিয়ে চলা প্রায় অসম্ভব। গাড়ির রাস্তায় নামলে রিকশা ও বাসের ভিড়ে প্রাণ যায় যায় অবস্থা!”


আইন আছে, বাস্তবায়ন নেই

বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, ফুটপাত শুধুমাত্র পথচারীদের চলাচলের জন্য বরাদ্দ। কিন্তু বাস্তবতায় এর প্রতিফলন নেই বললেই চলে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালালেও, তা স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারছে না।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়:

“আমরা প্রতিদিন অভিযান চালাই, হকারদের সরিয়ে দেই। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবার তারা ফিরে আসে। রাজনৈতিক ছত্রছায়া, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল ও পুলিশের অনুপস্থিতি—সব মিলিয়ে টেকসই সমাধান করা যাচ্ছে না।”


পথচারীরা কোন অপরাধে রাস্তায় হাঁটবেন?

একটি সভ্য শহরে নাগরিকদের নিরাপদে চলাচলের অধিকার মৌলিক। কিন্তু ঢাকায় প্রতিনিয়ত দেখা যায়, হকারদের জায়গা দিতে গিয়ে পথচারীরা রাস্তায় নামতে বাধ্য হন। এতে শুধু দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে না, যানজটও ভয়াবহ আকার ধারণ করে।

বিশেষ করে নারী ও শিশুদের জন্য এটি ভয়াবহ এক অভিজ্ঞতা। কলেজছাত্রী মৌরি আক্তার বলেন,

“ফুটপাতের কারণে আম্মু আমাকে এখন একা কোথাও যেতে দিতে চান না। কারণ হাঁটার পথে নিরাপত্তা নেই, হকারদের ভিড়ে কেউ কিছু বললে প্রতিবাদ করাও যায় না।”


কারা এই দখলদার?

ফুটপাত দখলকারীদের পেছনে যে একটি বিশাল সিন্ডিকেট কাজ করে, তা বলাই বাহুল্য। হকাররা দিনে ২০০-৫০০ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দেন বিভিন্ন স্তরের দালাল, পুলিশের কনস্টেবল বা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের। এই চাঁদার বিনিময়ে তারা নির্দ্বিধায় ফুটপাত দখল করে রাখতে পারেন।

শাহবাগ মোড়ে এক হকার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

“চাঁদা দেই বলেই বসতে পারি। না হলে পুলিশ এসে সব কিছু উঠিয়ে নিয়ে যায়।”

ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে?
ফুটপাতে শৃঙ্খলা ফিরবে কবে? 11

সমাধানের পথ কি নেই?

বিশ্লেষকদের মতে, এই সমস্যার সমাধান অবশ্যই আছে—শুধু প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক কঠোরতা এবং সামাজিক সচেতনতা।

১. বিকল্প হকার জোন:

বিভিন্ন দেশে হকারদের জন্য নির্দিষ্ট “হকার জোন” তৈরি করা হয়। সেখানে নির্দিষ্ট সময় এবং নিয়ম মেনে তারা ব্যবসা করতে পারে। ঢাকার মতো শহরে ওয়ার্ডভিত্তিক হকার জোন গড়ে তোলা যেতে পারে।

২. আইনের কঠোর বাস্তবায়ন:

একাধিকবার উচ্ছেদ করেও যারা বারবার ফুটপাত দখল করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু মালামাল জব্দ করলে হবে না, জরিমানা ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থাও জরুরি।

৩. চাঁদাবাজি বন্ধ করা:

ফুটপাত দখলের পেছনে যেসব রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি কাজ করছে, তাদের বিচারের আওতায় আনতে হবে। এটি দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হওয়া উচিত।

৪. জনসচেতনতা বৃদ্ধি:

পথচারীরাও অনেক সময় ফুটপাতের ওপর দোকান থেকে কেনাকাটা করে দখলকে উৎসাহ দেন। নাগরিকদের সচেতন হতে হবে যে, হকারদের কাছ থেকে ফুটপাতে কেনাকাটা মানেই নিজের হাঁটার পথকে সংকুচিত করা।


সরকার ও নগর কর্তৃপক্ষের ভূমিকাই মূল

বর্তমানে ঢাকা শহরে উন্নয়নের নামে সড়ক প্রশস্তকরণ, ওভারপাস, ফ্লাইওভার নির্মাণ হলেও, ফুটপাতের বিষয়ে কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নেই। অথচ একটি শহরের মানুষের পদযাত্রা যত নির্বিঘ্ন হবে, সেই শহর ততটাই সভ্য ও মানবিক।

শহরের স্থপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ ইকবাল হোসেন বলেন,

“আমরা বড় বড় অবকাঠামো বানিয়ে উন্নয়ন দেখাতে চাই, কিন্তু সাধারণ মানুষকে হাঁটার জায়গা দিতে চাই না। এটা কোনো সভ্য শহরের চিহ্ন হতে পারে না।”

You may also like

মতামত দিন

ঠিকানা

marbanglasongbad logo

আমার বাংলা সংবাদ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।

প্রকাশক ও সম্পাদক : হাসান মাহমুদ,
বিভাগীয় প্রধান ( অনলাইন): সাইফ উদ্দিন

জনপ্রিয় সংবাদ

নিউজলেটার

সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পেতে নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
-
00:00
00:00
Update Required Flash plugin
-
00:00
00:00