প্রচ্ছদ সারাবাংলা যশোরে উদীচী হত্যাকাণ্ড: ২৬ বছরেও রহস্যের জট খুলেনি সমাধান কবে?

যশোরে উদীচী হত্যাকাণ্ড: ২৬ বছরেও রহস্যের জট খুলেনি সমাধান কবে?

দ্বারা নিজস্ব প্রতিনিধি
০ কমেন্ট 4 মিনিট পড়ুন
যশোরে উদীচী হত্যাকাণ্ড: ২৬ বছরেও রহস্যের জট খুলেনি সমাধান কবে?

যশোরে চাঞ্চল্যকর উদীচী হত্যাকাণ্ডের কোনো কূলকিনারা হয়নি দীর্ঘ ২৬ বছরেও। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচার সম্পন্ন হলেও প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে হামলায় নিহত তপনের অশীতিপর মা শামসুন্নাহার রেনু সন্তান হত্যার বিচার না দেখেই পরপারে চলে গেছেন।

১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোর টাউন হল ময়দানে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর দ্বাদশ সম্মেলন শেষে অনুষ্ঠান চলাকালীন রাত ১২টা ৫০ মিনিটে আকস্মিকভাবে একটি বিকট শব্দের মাধ্যমে অনুষ্ঠান লন্ডভন্ড হয়ে যায়। এই নারকীয় হামলায় যশোর জেলা উদীচীর কর্মী শেখ নাজমুল হুদা তপন, সন্ধ্যারাণী ঘোষ, স্বর্ণশিল্পী বাবুল সূত্রধর, কুষ্টিয়া জেলা সংসদের কর্মী রামকৃষ্ণ রায়, পাম্প মিস্ত্রি ইলিয়াস মোল্লা, শ্রমিক নুরুল ইসলাম, কুষ্টিয়া লালন একাডেমির শিল্পী শাহআলম, কুষ্টিয়া উদীচীর কর্মী রতন কুমার বিশ্বাস, শাহআলম মিলন এবং সৈয়দ বুলু—এই দশজন শিল্পী ও দর্শক-শ্রোতা নিহত হন।

এছাড়া, উদীচীর অনুষ্ঠান দেখতে গিয়ে সেদিন অঙ্গহানি ঘটে সুকান্ত, নাহিদসহ কয়েকজনের। বোমার স্প্লিন্টারের আঘাতে আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ, যাদের মধ্যে অনেকেই আজও অসহনীয় যন্ত্রণা নিয়ে সংকটাপন্ন জীবনযাপন করছেন।

এই হত্যাকাণ্ডের বিচারের বাণী আজও নীরবে কাঁদে। বিভীষিকাময় ওই ঘটনার ২৬ বছর পার হলেও এখনও প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও বিচার করা সম্ভব হয়নি। নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা এবং যশোরের সাংস্কৃতিক কর্মীরা চরম হতাশায় ভুগছেন। তাদের প্রশ্ন, আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের বিচার পেতে।

বিচারের এই দীর্ঘসূত্রিতায় হতাশ হয়ে পড়েছেন নিহত ও আহতদের পরিবারের সদস্যরা। তারা চান, চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের পুনঃতদন্তের মাধ্যমে হামলাকারীদের শনাক্ত করে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।

১৯৯৯ সালের ওই বোমা হামলার ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তবে তদন্ত সংস্থার ত্রুটিপূর্ণ চার্জশিটের কারণে ২০০৬ সালের ৩০ মে আদালত থেকে খালাস পেয়ে যায় মামলার সব আসামি। পরে সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করলে মামলাটি পুনরুজ্জীবিত হয়। কিন্তু এরপর মামলাটির আপিল শুনানি আর হয়নি, আইনের বেড়াজালে আটকে আছে।

এ রায়ের বিরুদ্ধে ২০১০ সালে উদীচী এবং ২০১১ সালে সরকার হাইকোর্টে আপীল করলে তা গৃহীত হয়। এরপর উচ্চ আদালতের নির্দেশে ১৭ আসামি আত্মসমর্পণ করে জামিন নেন। বিচারের এই দীর্ঘসূত্রিতায় ক্ষুব্ধ যশোরের মানুষ।

নাজমুল হুদা তপনের বোন নাজমুন সুলতানা বিউটি বলেন, ‘আজ ২৬ বছর আমার ভাই নিহত হয়েছে। আমার আম্মা তার জন্য কাঁদতে কাঁদতে চরম অসুস্থ হয়ে পড়েন। বছরের পর বছর তিনি শয্যাশায়ী ছিলেন। সর্বশেষ সন্তান হত্যার বিচার না দেখেই গত ১৭ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান।’

বোমা হামলায় আহত নাহিদের বাবা মুনছুর আলী বলেন, ‘আমার ছেলে উদীচীর বোমা হামলায় আহত হয়। তার দুটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। আমরা দীর্ঘ সময় ধরে বিচারের আশায় বসে আছি। কিন্তু বিচার পাচ্ছি না। আমার ছেলেটার দুটি পা না থাকায় স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে তাকে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে।’

বোমা হামলায় পা হারানো সাংস্কৃতিককর্মী সুকান্ত দাস বলেন, ‘উদীচী হত্যাকাণ্ড আমরা ভুলতে পারিনি। আমরা সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচার চাই। কিন্তু সরকার বদলের পর সব পাল্টে গেছে। এ মামলার বাদী রাষ্ট্র। তাদের মাথাব্যথা আছে বলে মনে হয় না। তবে ৫ আগস্টের পর নতুন সরকার কিছু করবে আশা করি। তারা উদ্যোগ নিলে একটি বড় কাজ হবে।’

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট যশোরের সাধারণ সম্পাদক সানোয়ার আলম খান দুলু বলেন, ‘আমরা ২৬ বছর ধরে বিচার চাইলেও এ হত্যাকাণ্ডের বিচার পাইনি। এ বোমা হামলা নিয়ে রাজনীতিকরণ হয়েছে। একদল আরেক দলের ওপর অভিযোগ চাপিয়েছে। ভিন্ন দল আবার ক্ষমতায় এসে আরেক দলের ওপর অভিযোগ চাপিয়েছে। মাঝখান থেকে প্রকৃত অপরাধীরা পার পেয়ে গেছে।’

অবিলম্বে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘বিচারহীনতার কারণে এটা একটি কলঙ্কিত অধ্যায় হিসেবে দেশবাসী, বিশ্ববাসী ও আগামী প্রজন্মের কাছে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

দীর্ঘ সময়েও বিচার না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ উদীচী যশোরের নেতারা। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান খান বিপ্লব বলেন, ‘রাষ্ট্রের উচিত বিচার করা। কিন্তু কোনো সরকারই প্রকৃত সত্য উদঘাটন করল না। আমরা আসলে বিক্ষুব্ধ। পুনঃতদন্তের প্রক্রিয়াটাও আটকে আছে। আমরা চাই, সরকার যত দ্রুত সম্ভব এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিচার সম্পন্ন করুক।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সরকার পক্ষের আইনজীবী সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু বলেন, ‘উদীচীর এই হত্যাকাণ্ড অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক ঘটনা। এ ঘটনাটি যখন ঘটে তখন আমাদের নেতা তরিকুল ইসলাম (বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী) আহতদের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। রক্তের যোগান নিশ্চিত করতে নিজে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ও জনতাকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। অথচ রাজনৈতিক কারণে তাকেই এ হত্যা মামলার আসামি করা হয়েছিল।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ মামলায় রায় হয়েছিল। সব আসামি খালাস পাওয়ায় সংক্ষুদ্ধ ব্যক্তিরা মেনে নিতে পারেনি বলে পুনঃতদন্ত চেয়ে আপিল করেছেন। বিগত সরকারের সময় আপিল গ্রহণ হলেও কোনো আদেশ হয়নি। আমি পাবলিক প্রসিকিউটর হওয়ার পর এ মামলার কোনো নথিপত্র পাইনি। উচ্চ আদালত থেকে পরবর্তী কোনো আদেশ পেলে আমরা মামলাটি পরিচালনায় সবকিছু করব।

বোমা হামলার ভয়াবহ সেদিনটি স্মরণে উদীচী যশোরের উদ্যোগে সকাল ১০টায় যশোর টাউন হল মাঠে শহীদ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পমাল্য অপর্ণ, বেলা ১১টায় সংগঠন কার্যালয়ে স্মরণসভা ও সন্ধ্যায় যশোর টাউন হল ময়দানে আলোক প্রজ্বলন ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক কমসূচি পালিত হবে।

You may also like

মতামত দিন

ঠিকানা

marbanglasongbad logo

আমার বাংলা সংবাদ মিডিয়া এন্ড কমিউনিকেশন পক্ষে প্রকাশক কর্তৃক প্রকাশিত।

প্রকাশক ও সম্পাদক : হাসান মাহমুদ,
বিভাগীয় প্রধান ( অনলাইন): সাইফ উদ্দিন

জনপ্রিয় সংবাদ

নিউজলেটার

সর্বশেষ সংবাদ সবার আগে পেতে নিউজলেটার সাবস্ক্রাইব করুন।

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?
-
00:00
00:00
Update Required Flash plugin
-
00:00
00:00