রাজধানীর কারওয়ানবাজারে ডিবিবিএল ভবনে রবিবার ‘ইরান যুদ্ধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে যুদ্ধের প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনায় অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। ছবি: দেশকাল নিউজ
মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, আমদানি খরচ বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে অস্থিরতায় বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়া এবং পরিবহন খরচ বৃদ্ধিতে মূল্যস্ফীতি ও নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কোম্পানিগুলো সংকটে পড়লে সেখানে কর্মরত বাংলাদেশিরাও বেকার হয়ে যাবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই যুদ্ধের প্রভাব পড়বে পরিবহন খরচের ক্ষেত্রে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে, রফতানি পণ্যের ক্ষেত্রে, সার উৎপাদনের ক্ষেত্রে এবং তা মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দেবে। স্বাভাবিকভাবে মূল্যস্ফীতির হার এখন ১৩/১৪ শতাংশ। কিন্তু বিবিএস তাদের আগের ভিত্তি বছরে এই হিসাব করায় কম দেখাচ্ছে।
রাজধানীর কারওয়ানবাজারে ডিবিবিএল ভবনে রবিবার ‘ইরান যুদ্ধ ও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে যুদ্ধের প্রভাব’ শীর্ষক আলোচনায় অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা এই অভিমত ব্যক্ত করেন।
ভয়েস ফর রিফর্ম’র সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন পলিসি এক্সচেঞ্জ’র চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ শফিকুল আলম, পুঁজিবাজার বিশেষজ্ঞ আসিফ খান, বায়রা’র সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান, বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক শামস মাহমুদ ,জ্বালানি বিষয়ক সাংবাদিক মোল্লাহ আমজাদ।
যুদ্ধের প্রভাব উল্লেখ করে পলিসি এক্সচেঞ্জ’র চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, “ইরান-ইসরাইল যুদ্ধের প্রভাব ফরেন এক্সচেঞ্জ আমাদের সবগুলোই খারাপ হবে। এক্সপোর্টে হিট করতে পারে। আমাদের ওভারসিজ মাইগ্রেশন জব মাইগ্রেন্ট ওয়ার্কার্স সেই জায়গায় হিট করতে পারে। আমাদের ভর্তুকি বাড়াতে হবে। এরইমধ্যে ১৭ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ চেয়েছে জ্বালানি খাত।”
তিনি বলেন, “আপনি হয়ত এই টাকা ব্যাংক থেকে দিলেন কিন্তু বৈদেশিক মুদ্রা কোথায় পাবেন?”
মাশরুর রিয়াজ বলেন, “২০১১ সাল থেকে তো আমাদের ডোমেস্টিক কূপ অনুসন্ধান টোটালি বন্ধ। এখন জাপানও এলএনজি’র বড় অংশ ইমপোর্ট করে আনে। কিন্তু জাপানের তো ক্যাপেবিলিটি আছে, তারপরেও জাপান এখন চিন্তা করছে যে কীভাবে ডোমেস্টিক রিনিউবলে যাবে। তারা নতুন টেকনোলজি আবিষ্কার করার চেষ্টা করছে। কারণ ওদের দৃষ্টিতে এই ইমপোর্ট ডিপেন্ডেসি সাস্টেইনেবল নয়।”
তিনি বলেন, “আমাদের টোটাল এনার্জির ৬৩ শতাংশ আমদানি করে আনতে হয়।”
যুদ্ধের প্রভাবে মানুষের জীবনযাত্রায় নাভিশ্বাস উঠবে। মূল্যস্ফীতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কার কথা জানান পলিসি এক্সচেঞ্জ’র চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ।
ব্যবসায়ী নেতা শামস মাহমুদ বলেন, “আমাদের গার্মেন্টস শিল্প ভালো অবস্থায় নেন। আমাদের এই শিল্পে স্ট্রাকচারাল প্রবলেম রয়েছে তা ঠিক হয়নি। আমরা জোড়াতালি দিয়ে চলছি।”
বিজিএমইএ’র সাবেক এই নেতা বলেন, “ইউরোপের বাজারে নতুন আইনের কারণে অর্ডার পতন ইরানের ক্রাইসিসের আগেই শুরু হয়েছে। ৫০ শতাংশের ওপর যেখানে আমি এক্সপোর্ট করি। ওই মার্কেটটাই একটু আনস্টেবল হয়ে গেছে। এখন ইরানের সমস্যার জন্য সেটি আরও বাড়বে।”
তিনি বলেন, “আগামী বাজেটে সরকারকে খুব দৃঢ়তার সঙ্গে পদক্ষেপ নিতে হবে। আমাদের ডোমেস্টিক যে এনার্জি পলিসি সেটিও বহু বছর ভুলপথে চলছে। এখানে ইমারজেন্সি ম্যানেজমেন্ট এবং কন্টিনজেন্সি প্ল্যানিং এবং ম্যানেজমেন্ট করতে হবে। মোট কথা আমাদের এনার্জি পলিসিকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন।”
বায়রা’র সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, “যুদ্ধের যে কি প্রভাব জনশক্তি রফতানিতে হচ্ছে তার বাস্তবচিত্র পাবেন যদি বিমানবন্দরে গিয়ে কিছুটা সময় ঘুরে দেখেন। এই সেক্টরটা কোথায় দাঁড়িয়ে আছে? ফ্লাইট নেই, জনশক্তি রপ্তানিটা বন্ধ।”
তিনি বলেন, “কর্মীদের ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে প্রায় আড়াই হাজার এজেন্সি কাজ করে। তাদের হাতে যে ডিমান্ডগুলো রয়ে গেল সেগুলো আন্ডার প্রসেসিং এবং জটিল হয়ে গেছে। ফ্লাইট স্থগিতের জন্য ভিসা এক্সপায়ার হয়ে যাচ্ছে। ফ্লাইট যাচ্ছে না বা এমপ্লয় নিচ্ছে না।”
তিনি বলেন, “এক কলিগের কিছু লোক গেছে কাতারে। কাতারে প্লেন নামতে পারেনি। অন্য জায়গায় যাত্রী নামিয়ে দিয়েছে। ওখান থেকে কিছু প্যাসেঞ্জারকে তারা কাতার নিয়ে গেছে। কিছু প্যাসেঞ্জারকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে। এখন এই যে লোকগুলো গেল, এরা তো কোনো দোষ করেনি। এদের ক্ষতি কীভাবে পোষানো হবে? সে তো খরচ করে ফেলেছে সব। এখন জনশক্তি রপ্তানিখাতে এই ক্রাইসিস চলছে।”
বায়রার সাবেক নেতা বলেন, “বিদেশে যারা কর্মরত আছেন তারাও তাদের লাইফ সেফটি আগে ভাবছেন। এখন চাকরি করবে কি, করবে না সেটি হলো পরের ব্যাপার। প্রথমে তাকে জীবন বাঁচাতে হবে।”
“মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর এই মার্কেটগুলো খোলা আছে। সেই সব জায়গায় দূতাবাস আছে তাদের অনুরোধ করব ভিসাগুলো যেন সহজতর করতে পারি। তা না হলে সামনের দিনগুলো আমাদের জন্য খুবই চ্যালেঞ্জের হবে” বলেন তিনি।
জ্বালানি বিটের সাংবাদিক মোল্লাহ আমজাদ বলেন, “আমাদের জ্বালানিতে দুর্ভিক্ষ অবস্থা বিরাজ করছে। তাই কয়লার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। প্রতিবছর অন্তত ৫০টি কূপ অনুসন্ধান করা যায় ভাবতে হবে। আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত এরকম একটা পরিকল্পনা নিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি সম্প্রসারণ করতে হবে। ক্রস বর্ডার ট্রেডকে জোরদার করতে হবে।”
তিনি বলেন, “জ্বালানি নিয়ে আগামীতে শিল্পক্ষেত্রে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। একমাত্র টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রিতে গ্যাসের ঘাটতি থাকবে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতায় আমরা যদি পিছিয়ে থাকি তাহলে তা বড় ধরনের বিপত্তি ডেকে আনবে।