ডিসেম্বর বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় কক্সবাজারের। সারাবছরের অপেক্ষায় থাকা পর্যটননগরী হয়ে ওঠার কথা লাখো মানুষের পদচারণায় মুখর। কিন্তু এবারের দৃশ্য একেবারেই ভিন্ন-ফাঁকা সৈকত, খালি রুম, হতাশ ব্যবসায়ী আর অনিশ্চয়তার চাপ। দেশের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার যেন থমকে আছে এক অদ্ভুত নীরবতায়।
সৈকতে নীরবতা, থমকে ব্যবসা
ডিসেম্বরজুড়ে যে কক্সবাজারে পর্যটকের ঢল নামার কথা, সেই শহর এখন অনেকটাই নীরব। লাবণী, সুগন্ধা, কলাতলী-কোথাও নেই চিরচেনা ভিড়। ঘোড়াওয়ালা, ফটোগ্রাফার, জেড স্কী অপারেটর, কিটকট ব্যবসায়ী-সবার মুখে একই অভিযোগ, ‘পর্যটক নেই, আয় নেই, জীবিকা চলছে ধার-দেনায়।’
লাবণী পয়েন্টের ঘোড়াওয়ালা মোহাম্মদ জুনায়েদ বলেন, ‘গত বছর প্রতিদিন লাখের ওপর পর্যটক ছিল। এ বছর বেলা ১১টায় সৈকতে দুই হাজার মানুষও নেই। ব্যবসা প্রায় বন্ধ।’
ফটোগ্রাফার মো. ছফুর মনে করেন, ‘এটি তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে খারাপ মৌসুম। কাজ নেই, আয় নেই-পর্যটন মৌসুমে এমন অবস্থা আগে দেখিনি।’
৩০ বছর ধরে সৈকতে ব্যবসা করা কিটকট (ছাতা) ব্যবসায়ী মুফিজ হোসেন হতাশ স্বরে বলেন, ‘এমন খারাপ সময় আর কখনো দেখিনি। কর্মচারীর বেতন, নিজের সংসার-কিছুই সামলাতে পারছি না।’
১৬ বছর ধরে জেড স্কী চালানো ইউসুফের গল্পও একই- ‘পর্যটক নেই। সংসার চলছে ধার করে।’
হোটেল-রেস্তোরাঁয় টানাপোড়েন
কক্সবাজারের তারকামানের হোটেলগুলো সাধারণত ডিসেম্বরজুড়ে প্রায় শতভাগ বুকিং নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করে। কিন্তু এবার বুকিং নেমে এসেছে মাত্র ২০ শতাংশে। রেস্তোরাঁগুলোও প্রায় ফাঁকা।
হোটেল ‘প্রাসাদ প্যারাডাইস’-এর মহাব্যবস্থাপক মো. ইয়াকুব আলী জানান, গত বছর ডিসেম্বরজুড়ে প্রতিদিন ৯০ শতাংশ রুম ভরা ছিল। এ বছর ৮০ শতাংশ রুম খালি পড়ে আছে।
হোটেল ‘কক্স-টুডে’-এর ব্যবস্থাপক আবু তালেব শাহ মনে করেন রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মানুষের মনে ভয় তৈরি হয়েছে। ‘বুকিং তো নেই-ই, ক্যানসেলেশনও নেই-কারণ ফোনই আসছে না।’
রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন বড় সংকটে। সুরমা রেস্টুরেন্টের পরিচালক তানজিম হোসেন হাওলাদার বলেন, ‘রোজগার নেই। কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছি।’
বার্মিজ পণ্যের দোকানেও মন্দা
ডিসেম্বরকে সামনে রেখে লাখ লাখ টাকার পণ্য মজুত করেছিলেন বার্মিজ পণ্যের ব্যবসায়ীরা। কিন্তু দোকানে পর্যটক নেই, নেই বেচাকেনা।
দোকানদার হুমায়ুন কবির জানান, গত বছর প্রতিদিন ৮০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি হতো। এবার ৫–৬ হাজার টাকাতেও দিন যেতে চাইছে না।
পর্যটকের অভাবে পরিবহন শ্রমিকরাও বিপাকে
হোটেলের সামনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও যাত্রী পাচ্ছেন না ইজিবাইক ও অটোরিকশা চালকরা।
ইজিবাইকচালক শামশুল আলম বলেন, ‘সকাল ৮টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি, ১০টা বাজে—একজন পর্যটকও পাইনি। মনে হয় হোটেলেই অতিথি নেই।’